জিপিটি-৫ সম্প্রতি ওপেনএআই তাদের নতুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক চ্যাটবট জিপিটি-৫ উন্মোচন করেছে। ওপেনএআইয়ের অফিসিয়াল ব্লগে ঘোষণার পর থেকেই এ নিয়ে প্রযুক্তি মহলে চলছে ব্যাপক আলোচনা। বিশেষ করে, এই নতুন মডেলটি বিনামূল্যে ব্যবহার করা যাবে—যা বিশ্বজুড়ে ব্যবহারকারীদের কাছে এক বিশাল আকর্ষণ।
কেন জিপিটি-৫ এত আলোচিত? জিপিটি-৫
আগের চ্যাটবট মডেলগুলোর তুলনায় জিপিটি-৫ অনেক বেশি বুদ্ধিমান, দ্রুত এবং নির্ভুলভাবে উত্তর দিতে সক্ষম।
- প্রশ্নের উত্তর না জানলে এটি এখন সরাসরি স্বীকার করে নেয়
- ভুল তথ্য দেওয়ার প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে
- মানুষের সাথে কথোপকথনের মতো প্রাকৃতিক টোন
- গভীরভাবে চিন্তা করে উত্তর দেওয়ার ক্ষমতা, যা ওপেনএআই ‘রিজনিং মডেল’ হিসেবে অভিহিত করেছে
জাদুকরি ফিচার: ভাইব কোডিং
জিপিটি-৫-এর সবচেয়ে আলোচিত ক্ষমতা হলো ভাইব কোডিং। এর মাধ্যমে:
- জটিল প্রোগ্রামিং জ্ঞান ছাড়াই অ্যাপ বা ওয়েবসাইট তৈরি করা যাবে
- শুধু নিজের চাহিদা লিখে দিলেই চ্যাটবট পুরো কোড তৈরি করে দেবে
- উন্মোচন অনুষ্ঠানে ফরাসি শেখার জন্য ফ্ল্যাশ কার্ড, কুইজ এবং প্রগ্রেস ট্র্যাকিং সিস্টেমসহ দুটি ভিন্ন অ্যাপ মুহূর্তে তৈরি করে দেখিয়েছে
বাংলাদেশে মুঠোফোন সিমের সংখ্যা সীমিতকরণ: নতুন নিয়ম ও এর প্রভাব
বিশেষজ্ঞদের মতামত
ওপেনএআইয়ের প্রধান স্যাম অল্টম্যান মনে করেন,
“জিপিটি-৫ মানে আপনার পাশে সবসময় পৃথিবীর সেরা লেখক, বিজ্ঞানী এবং প্রোগ্রামারদের একটি দল বসে আছে।”
জিপিটি-৫ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জগতে নতুন বিপ্লব
তবে সবাই তার সঙ্গে একমত নন।
- অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ক্যারিসা ভেলিজ মনে করেন, এর প্রভাব হয়তো অতটা তাৎপর্যপূর্ণ নয় যতটা প্রচার করা হচ্ছে।
- বিবিসির এআই প্রতিবেদক মার্ক সিসলাক, যিনি আনুষ্ঠানিক প্রকাশের আগেই এটি ব্যবহার করেছেন, উল্লেখ করেছেন যে বড় ধরনের পরিবর্তন তিনি লক্ষ্য করেননি।
বর্তমান সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence) প্রযুক্তি আমাদের দৈনন্দিন জীবন, কাজের ধরন এবং চিন্তাভাবনায় ব্যাপক পরিবর্তন আনছে। এই পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি উন্মুক্ত হওয়া জিপিটি-৫ প্রযুক্তি বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এখন জিপিটি-৫ সবাই বিনামূল্যে ব্যবহার করতে পারছেন। ফলে কেবল প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ বা গবেষকদের মধ্যেই নয়, সাধারণ ব্যবহারকারীদের মাঝেও এই উন্নত এআই মডেলটি পরীক্ষা করে দেখার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
আপনার করণীয় প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো—নিজে ব্যবহার করে দেখা। কোনো প্রযুক্তির প্রকৃত শক্তি ও দুর্বলতা বোঝার জন্য শুধু অন্যের মতামতের ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট নয়। বরং নিজের কাজের প্রেক্ষাপটে এটি কতটা কার্যকর, কতটা সহায়ক বা কতটা সময় বাঁচাতে পারে—তা নিজ অভিজ্ঞতার মাধ্যমে বিচার করাই বুদ্ধিমানের কাজ। লেখালেখি, অনুবাদ, তথ্য সংগ্রহ, পড়াশোনা, কোডিং, আইডিয়া জেনারেশন কিংবা অফিসিয়াল ডকুমেন্ট তৈরির মতো কাজে জিপিটি-৫ ব্যবহার করে দেখুন এবং আগের সংস্করণগুলোর সঙ্গে তুলনা করুন।
আগের মডেলগুলোর তুলনায় জিপিটি-৫ কতটা উন্নত, সেটি বুঝতে হলে নির্দিষ্ট কিছু বিষয় খেয়াল করা জরুরি। যেমন—উত্তরের গভীরতা, ভাষার সাবলীলতা, প্রাসঙ্গিকতা, জটিল প্রশ্ন বোঝার ক্ষমতা এবং দীর্ঘ আলোচনায় ধারাবাহিকতা বজায় রাখার দক্ষতা। একই ধরনের প্রশ্ন বা কাজ আগের মডেল এবং জিপিটি-৫—উভয় ক্ষেত্রেই ব্যবহার করে দেখলে পার্থক্যটি আরও স্পষ্টভাবে বোঝা যাবে। এতে করে আপনি নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন, এটি আপনার কাজের গতি ও মান কতটা বাড়াতে পারছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ করণীয় হলো—জিপিটি-৫ কে সহকারী হিসেবে ব্যবহার করা, বিকল্প হিসেবে নয়। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, উন্নত এআই প্রযুক্তি মানুষের চাকরি বা সৃজনশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সঠিকভাবে ব্যবহার করলে এআই আমাদের কাজকে আরও সহজ, দ্রুত ও কার্যকর করতে পারে। নিজের চিন্তাভাবনা, বিচার-বিবেচনা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বজায় রেখে জিপিটি-৫ কে একটি স্মার্ট টুল হিসেবে কাজে লাগানোই হবে সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি।
শিক্ষার্থীদের জন্য জিপিটি-৫ হতে পারে একটি শক্তিশালী শেখার সহায়ক। জটিল বিষয় সহজভাবে বোঝা, নোট তৈরি, ধারণা পরিষ্কার করা কিংবা প্র্যাকটিস প্রশ্ন সমাধানে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এখানে সতর্ক থাকা জরুরি—শুধু উত্তর কপি করার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে, কেন সেই উত্তরটি এমন হলো তা বোঝার চেষ্টা করা। তাহলেই এই প্রযুক্তি সত্যিকার অর্থে শিক্ষার মান উন্নয়নে সহায়ক হবে।
পেশাজীবীদের ক্ষেত্রেও জিপিটি-৫ নানা সুযোগ তৈরি করেছে। রিপোর্ট লেখা, ইমেইল ড্রাফট করা, প্রেজেন্টেশনের কাঠামো তৈরি, এমনকি নতুন ব্যবসায়িক আইডিয়া ভাবনার ক্ষেত্রেও এটি সহায়ক হতে পারে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও দায়িত্ব অবশ্যই মানুষের হাতেই থাকা উচিত। এআই-এর দেওয়া তথ্য যাচাই করা এবং বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়াও আপনার করণীয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
শেষ কথা জিপিটি-৫
জিপিটি-৫ নিঃসন্দেহে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জগতে একটি বড় ও তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ। এর উন্নত ভাষা বোঝার ক্ষমতা, বিশ্লেষণধর্মী উত্তর দেওয়ার দক্ষতা এবং বহুমুখী ব্যবহারের সুযোগ এটিকে আগের সংস্করণগুলোর তুলনায় অনেক এগিয়ে রেখেছে। তবে যেকোনো নতুন প্রযুক্তির মতোই, এর প্রকৃত ক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পেতে সময় লাগবে।
শুরুতে হয়তো আমরা জিপিটি-৫ কে নিয়ে অতিরিক্ত প্রত্যাশা তৈরি করতে পারি, আবার কেউ কেউ অযথা ভয়ও পেতে পারেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো—সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্যবহারকারীদের অভিজ্ঞতা, বাস্তব প্রয়োগ এবং গবেষণার মাধ্যমেই এর আসল প্রভাব স্পষ্ট হবে। এটি কি সত্যিই আমাদের কাজের ধরন আমূল পাল্টে দেবে, নাকি কেবল প্রযুক্তি দুনিয়ার আরেকটি আলোচিত বিষয় হিসেবেই থেকে যাবে—এই প্রশ্নের উত্তর একদিনে পাওয়া সম্ভব নয়।
সম্ভবত ধীরে ধীরে আমরা বুঝতে পারব, জিপিটি-৫ একটি শক্তিশালী হাতিয়ার, যা সঠিকভাবে ব্যবহার করলে মানুষের সক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। তবে ভুল বা অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা তৈরি হলে এর নেতিবাচক প্রভাবও দেখা দিতে পারে। তাই ভারসাম্য বজায় রাখাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সবশেষে বলা যায়, জিপিটি-৫ কে ভয় নয়—বোঝার চেষ্টা করুন, ব্যবহার করুন এবং নিজের অভিজ্ঞতা থেকে সিদ্ধান্ত নিন। প্রযুক্তি কখনোই মানুষের বিকল্প নয়; বরং এটি মানুষের দক্ষতা বাড়ানোর একটি মাধ্যম। ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যেতে হলে, এই নতুন প্রযুক্তিকে গ্রহণ করার পাশাপাশি সচেতন ও দায়িত্বশীল ব্যবহারই হবে আমাদের সবচেয়ে বড় করণীয়।